যেকোন নির্বাচনে সব প্রার্থীই জয় প্রত্যাশা করেন। যদিও জয় পান মাত্র একজনই। তাই পরাজিত প্রার্থীদের কাছে সব সময় নির্বাচনের ফল অপ্রত্যাশিত মনে হতেই পারে। তবে সবাইকে অবাক করা অপ্রত্যাশিত ফলের নির্বাচনও বিশ্ব জুড়ে কম দেখা যায়নি। অপ্রত্যাশিত ফলাফলের ওইসব নির্বাচনের সংখ্যা একেবারে কমও নয়। নিকট অতীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ট ট্রাম্পের বিজয়, নাৎসি দলের নেতা হিটলারের চ্যান্সেলর নির্বাচিত হওয়া বা বৃটেনে জনপ্রিয়তায় শীর্ষে থাকা চার্চিলের পরাজয় তাদের কয়েকটি। খুঁজে দেখা যাক সেই অপ্রত্যাশিত নির্বাচনী ফলাফলের কয়েকটি সম্পর্কে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন প্রেসিডেন্ট
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হলে পুরো বিশ্বই চমকে উঠে। তার বিজয়ের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গতানুগতিক রাজনৈতিক চিন্তা-ধারায় বড় ধরনের ধাক্কা খায়।
হিটলারের পরাজয় নাকি জয়
১৯৩২ সালের নির্বাচনে জার্মানীতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্ধীর একজন ছিলেন পল ভন হিনডেনবার্গ ও অ্যাডলফ হিটলার। নির্বাচনে হিটলার ৩৫ শতাংশ ভোট পেয়ে পরাজিত হন।
তাহলে তিনি কিভাবে চ্যান্সেলর হলেন কিভাবে? জার্মান সরকারের তখন ছত্রভঙ্গ অবস্থা। জার্মানিকে বিশ্বের মধ্যে শক্তিশালী এক জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কোন উপায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এমন অবস্থায় হিনডেনবার্গ সরকারের হাত শক্তিশালী করার উদ্দেশে হিটলারকে চ্যান্সেলর পদে নিয়োগ দেন। যা ছিল সবারই জন্যই প্রত্যাশিত। নির্বাচনে পরাজিত হিটলার ক্ষমতার মসনদে বসলেন। তারপর পৃথিবীর ইতিহাস বাক নেয় ভিন্নদিকে। নতুন করে লেখা ওই ইতিহাসে হিটলারকে দেখা হয় বিশ্বের সবচেয়ে সমালোচিত নেতা হিসেবে।
তুমুল জনপ্রিয় উইনস্টন চার্চিলের পরাজয়
বৃটেনের ইতিহাসে উইনস্টন চার্চিলের মত জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী আর দেখা যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বিড়াট এক নিয়ামক হয়ে দাড়ায়। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী চার্চিল সবার পছন্দের ব্যক্তিতে পরিণত হন।
যুদ্ধকালীন সময় তিনি পুরো জাতিকে একাই সাহস যোগান। চার্চিল ভয়ানক ওই যুদ্ধে সফলতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিলেও যুদ্ধ পরবর্তী নির্বাচনে মুদ্রার অপর পিঠ দেখে ফেলেন। ১৯৪৫ সালের ওই নির্বাচনে চার্চিল পরাজিত হন ক্লেমেন্ট অ্যাটলির কাছে। চার্চিলের দল বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেন যে, সারা দেশ চার্চিলকে নায়কদের মর্যাদা দিয়ে প্রশংসা করলেও ভোটটি দিয়েছে অ্যাটলিকে।
বুশ বনাম গোর: আদালতের ঐতিহাসিক রায়
এটিকে বলা হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর নির্বাচনগুলোর একটি। ওই নির্বাচনে ফ্লোরিডার ফলের উপর নির্ভর করছিলো কে হতে যাচ্ছেন পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট। অথচ ফ্লোরিডাতে প্রতিদ্ধন্ধী দুই প্রার্থী হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রাথমিকভাবে দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের পার্থক্য ছিল শুণ্য দশমিক ৫ শতাংশ।
ফ্লোরিডা রাজ্যের আইন অনুযায়ী ভোট পুনঃগণনাতে ৩১৭ ভোটে এগিয়ে ছিল বুশ। গোর আহবান জানালেন ম্যানুয়ালি গণনার। এরই মধ্যে বুশকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ফ্লোরিডার আদালত গোরের পক্ষ নিয়ে ভোট পুনঃগননার রায় দেয়। কিন্তু মার্কিন উচ্চ আদালত সবাইকে হতবাক করে দিয়ে পুনগননার ওই রায় স্থগিত করে দিলে প্রেসিডেন্ট পদে বসতে আর কোন বাধা থাকে না বুশের। বলা হয়ে থাকে ফ্লোরিডাতে আবার নির্বাচন হলেও ওই সময় গোর পরিস্কার ব্যবধানে জয়ী হতেন এবং প্রেসিডেন্ট হতেন।
অনিবার্য হিলারি পরাজিত হলেন বারাক ওবামার কাছে
২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পূর্ভাবাসে বলা হয় হিলারির জয় অবশ্যম্ভাবী। তাই মনোনয়ন লাভ করে তার জয় লাভ সময়ের ব্যাপার মাত্র। সেময় হিলারি শুধুমাত্র তুমুল জনপ্রিয় সাবেক প্রেসিডেন্ট ‘বিল ক্লিনটনের স্ত্রী’এ পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন না। তিনি নিজেও ছিলেন ডেমোক্রেট দলের অন্যতম গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব।
তাই ধারণা করা হচ্ছিল, ডেমোক্রেট মনোনয়ন পাবার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন হিলারি। অথচ সবার জন্যই তখন বিড়াট এক বিস্ময় অপেক্ষা করেছিল। সবাইকে হতবাক করে দেন ইলিনোস থেকে আসা থেকে এক অপরিচিত সিনেটর বারাক ওবামা। অসাধারণ বক্তা আর ক্যাম্পেইনার ওবামা হিলারির কাছ শুধু মনোনয়নই ছিনিয়ে নেয়নি সঙ্গে জিতে নেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পদটিও।
কেনেডির কাছে পরাজিত হলেন নিক্সন
১৯৬০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কেউ ভাবেননি নিক্সন হেরে যাবেন। দুই মেয়াদে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে থাকা নিক্সনের ছিল শক্তিশালী কমিউনিস্টবিরোধী মনোভাব। সবকিছু মিলে তাকে মনে করা হচ্ছিল স্নায়ুযুদ্ধকালীন যোগ্য নেতা। কেননা তার বিপরীতে লড়ছিলেন অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক যুবক জন এফ কেনেডি। বেশ কয়েকটি বিষয়কে নিক্সনের পরাজয়ের কারণ হিসেবে মনে করা হয়। প্রথমত, ইলিনোইস রাজ্যে কেনেডি সামান্য ব্যবধানে জয় পান।
ইলিনোইস রাজ্যকে ধরা হয় গুরুত্বপূর্ণ সুইং ম্টেট হিসেবে। দ্বিতীয়ত, দুই প্রার্থীর মধ্যে তুলনামূলকভাবে কেনেডি ছিলেন আকর্ষণীয়, ক্যারিশমাটিক চরিত্রের অধিকারী এবং সর্বোপরি যুবা বয়সী। তৃতীয়ত, ওই বছর প্রথমবারের মত প্রার্থীদের বিতর্ক টেলিভিশনে প্রচার শুরু হয়। ওই বিতর্কে সাবলিল বক্তা ও স্টাইলিশ কেনেডিকে ভোটাররা তাৎক্ষনিকভাবে তাদের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে পছন্দ করে নেয়। বলা হয় ওই বিতর্ক টেলিভিশনে প্রচারিত না হলে হয়ত কেনেডি সেবছর সবাইকে বিস্মিত করা ওই বিজয় লাভ করতেন না।






No comments:
Post a Comment